বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেটে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের কতিপয় দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার লাগামহীন ঘুষ-বাণিজ্য ও হয়রানিতে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পোদ্যোক্তাদের নাভিশ্বাস উঠেছে। কথিত ‘অশুদ্ধ’ অভিযানের নামে ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্যবসায়ীদের পকেট কাটার পাশাপাশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের পাহাড় গড়েছেন সার্কেল-১ এর রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) মো. রেজওয়ান কবির এবং সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) কাউসার মৃধা। এই সিন্ডিকেটের অনৈতিক চাপে ইতোমধ্যে অনেক প্রতিশ্রুতিশীল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেউলিয়া বা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ভ্যাট আদায়ের আড়ালে সিলেটে রীতিমতো চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন কিছু অসাধু কর্মকর্তা। ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অন্যায়ভাবে শুল্ক আইনে মামলার হুমকি দিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা আদায় করা হচ্ছে। এই দৌরাত্ম্যের মর্মান্তিক শিকার গোটাটিকর এলাকার ‘মুনমুন কেমিক্যাল কোম্পানি’। কাস্টমস কর্মকর্তাদের মাত্রাতিরিক্ত ঘুষের চাপ সইতে না পেরে গত ১০ মে ২০২৪ তারিখে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী দিলীপ দেবনাথ তাঁর কারখানাটি চিরতরে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।
একইভাবে হয়রানির শিকার আরাফাত প্লাস্টিক স্টোর। ২০২৬ সালের জুনে ২০ হাজার টাকা ভ্যাট প্রদানকারী এই প্রতিষ্ঠানের ওপর জুলাই মাসে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ১ লাখ টাকা ভ্যাট চাপিয়ে দেওয়া হয়। এআরও কাউসার মৃধা প্রস্তাব দেন, মাসিক ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দিলে কোনো হয়রানি করা হবে না। এই অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় স্বত্বাধিকারী ইসমাইল হোসেনকে টানা ২১ দিন ভ্যাট অফিসে ঘুরিয়ে চরম মানসিক ও আর্থিক শাস্তি দেওয়া হয়।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রক্তচুষে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা গড়েছেন বিপুল সম্পদ। ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা আরও মো. রেজওয়ান কবির ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানে বহুতল ভবনের মালিক। প্রতি মাসে তিনি অন্তত চারবার বিমানে ঢাকা-সিলেট যাতায়াত করেন, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্যদিকে, ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা এআরও কাউসার মৃধারও ঢাকার মিরপুরের পশ্চিম বাইশটেকী এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট থাকার চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।
অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে তাদের ঘুষ আদায়ের সুসংগঠিত কাঠামো। আরও রেজওয়ান কবির ঘুষের অঙ্ক নির্ধারণ করেন এবং এআরও কাউসার মৃধা ব্যবসায়ীদের সাথে দরকষাকষি করে তা চূড়ান্ত করেন। আর এই অবৈধ লেনদেনের মূল কাজটি সম্পন্ন হয় অফিস সহায়ক রাজুর মাধ্যমে, যিনি তাদের ‘কালেকশন ম্যান’ হিসেবে পরিচিত। ঘুষের বিনিময়ে চোরাচালানকে প্রশ্রয় দেওয়ার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। গত ১২ জুলাই ২০২৬ তারিখে ভারতীয় শাড়ির একটি চোরাচালানকৃত চালান আটকের পর ৭ লাখ টাকার বিনিময়ে তা রফাদফা করে ছেড়ে দেন এই দুই কর্মকর্তা।
অভিযুক্তদের পলায়নপরতা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এই সুস্পষ্ট অভিযোগগুলোর বিষয়ে আরও মো. রেজওয়ান কবির ও এআরও কাউসার মৃধার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান রক্ষা ও রাষ্ট্রের রাজস্ব সুরক্ষার স্বার্থে এই দুর্নীতিগ্রস্ত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের জোরালো দাবি।
Leave a Reply